বাংলাদেশে “গুম” শব্দটি শুধু একটি আইনি বা রাজনৈতিক পরিভাষা নয়; এটি অসংখ্য পরিবারের দীর্ঘশ্বাস, অনিশ্চয়তা এবং অপেক্ষার আরেক নাম। কোনো ব্যক্তি হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর পরিবার যখন তার খোঁজে থানায়, আদালতে কিংবা মানবাধিকার সংস্থার দ্বারস্থ হয়, তখন তাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকে—“সে কি এখনো বেঁচে আছে?”

গত এক দশকে দেশে গুমের অভিযোগ নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ নাগরিক—বিভিন্ন সময় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার দাবি করেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে লোকজন কাউকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তার আর কোনো খোঁজ মেলেনি। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রায়ই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
গুমের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো অনিশ্চয়তা। একজন মানুষ মারা গেলে অন্তত তার মৃত্যুর সত্যটি পরিবার জানতে পারে। কিন্তু গুমের ঘটনায় পরিবার বছরের পর বছর অপেক্ষা করে—ফোন বেজে উঠলে মনে হয় হয়তো প্রিয়জন ফিরে এসেছে। এই মানসিক যন্ত্রণা শুধু পরিবারকে নয়, পুরো সমাজকে আতঙ্কিত করে তোলে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গুমের সংস্কৃতি আইনের শাসন ও মানবাধিকারের জন্য বড় হুমকি। কারণ কোনো নাগরিক যদি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষার বিষয়ে আস্থা হারায়, তাহলে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই গুমের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ সংবিধান নাগরিকের জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করেছে। সেই অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারব্যবস্থা এবং নাগরিক সমাজ—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। গুমের প্রতিটি অভিযোগ স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা না গেলে সমাজে ভয় ও অবিশ্বাস আরও বাড়বে।

